রামপ্রসাদ সরদার, কয়রা, খুলনাঃ সুন্দরবন সুরক্ষায় বাড়তি নিরাপত্তা প্রদানের জন্য বন কর্মীদের পবিত্র ঈদুল ফিতরের ঈদ কাটছে বনে-বাদাড়ে।
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। এ উৎসবকে ঘিরে বাড়ি ফেরেন কর্মজীবীরা। তবে সবার ভাগ্যে বাড়ি যাওয়ার সৌভাগ্য হয়ে উঠে না, সে তালিকায় রয়েছে বন কর্মীরা। পরিবার পরিজন ছাড়া বনের গহীনে টহলে ঈদ কাটছে তাদের। আক্ষেপ থাকলেও নিজেদের কর্তব্য পালনে খুশি বন কর্মীরা।
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের অধিনস্থ হায়াতখালী বন টহল ফাঁড়ির বন রক্ষী মোঃ আব্দুল গফফার বলেন, এ ঈদে ছুটি মেলেনি তার। সঙ্গীদের নিয়ে টহল দিচ্ছেন সুন্দরবনে। তিনি বলেন, সকারের অর্পিত দায়িত্ব পালন করাটা আমাদের কর্তব্য। তাই দেশের সম্পদ রক্ষায় পরিবার পরিজন ছাড়াই ঈদের দিনটাও কাটাতে হচ্ছে গহীন সুন্দরবনে। সুন্দরবন রক্ষায় ঈদের দিনেও টহল দিয়ে আমরা খুশি।’
আব্দুল গফফার একা নন, সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের প্রায় তিন শতাধিক বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ঈদের দিনেও সুন্দরবন রক্ষায় কাজ করছেন। বন পাহারায় দিন রাত কাজ করলেও আধুনিক যুগের কোনো সুবিধা পান না তারা। তাদের প্রত্যাশা অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো সুযোগ-সুবিধা পান।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঈদকে ঘিরে সুন্দরবনে বাড়তি সতর্কতা জারী করা হয়েছে। একইসঙ্গে সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বনকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে সরকার। সুন্দরবনের ভিতরে দায়িত্বরত বনরক্ষীদের টহল জোরদার করতেও বলা হয়েছে।
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোঃ শরিফুল ইসলাম জানান, সুন্দরবনে রেড অ্যালার্ট জারী করা হয়েছে। হরিণ ও বন্যপ্রাণী শিকার এবং অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সীমিত করা হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ছুটি দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, বন কর্মীদের পরিবার ছাড়া ঈদ কাটাতে হচ্ছে। ঈদের বিশেষ এ সময়টাতে শিকারীদের অপতৎপরতা বন্ধ এবং অগ্নি সন্ত্রাসীদের নাশকতারোধে রেঞ্জের সব স্টেশন ও টহল ফাঁড়ীর কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিশেষ টহল কার্যক্রম পরিচালনারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই মোতাবেক সুন্দরবন রক্ষায় দিন রাত কাজ করছেন বন বিভাগের স্টাফরা।
সোমবার সকালে সুন্দরবন সংলগ্ন কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, ঈদের ছুটিতে বাড়ীতে না গিয়ে পরিবার ছেড়ে সুন্দরবন রক্ষায় কাজ করছেন বন রক্ষীরা। সেখানে কাজ করা বন কর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনের চাকরীতে প্রায় ঈদেই ছুটি মেলে না। বিশেষ করে রোজার ঈদে বাড়ীতে যেতে পারি না। পরিবার ছাড়া ঈদ করা খুবই কষ্টের। তবে মানিয়ে নিতে হয়। এক সময় খারাপ লাগত। এখন আর খারাপ লাগে না।’
আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা ধরণের সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। শুধু বন বিভাগ সব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। দূর্গম ও ভয়ঙ্কর বনাঞ্চলে জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করতে হয়। বেতন ছাড়া অন্য তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই।’
সুন্দরবনের গেওয়াখালী বন টহল ফাঁড়ীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামাল হোসেন বলেন, ‘আমি সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে প্রায় এক যুগ ধরে আছি। এর মধ্যে একবার মাত্র পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছি। গহীন বনের এ এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কেরও সমস্যা রয়েছে। ঈদের দিন আমরা কয়েকজন স্টাফ মিলে একটা ব্রয়লার মুরগি আর একটু সেমাই রান্না করেছি। তাতেই আমরা খুশি।’
সুন্দরবনের শিবসা টহল ফাঁড়ীর দায়িত্বরত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালনে আমরা অবস্থান করছি নির্জন সুন্দরবনে।’
নলিয়ান স্টেশন কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘সকল সরকারী চাকুরীজীবিদের মতো সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগের স্টাফদেরও সকল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
কয়রা, খুলনা প্রতিনিধি