নিজস্ব প্রতিবেদক : গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাঠারে কারখানার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জুবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারী নিজেকে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে গত ৭ জুন দুদকে এ অভিযোগ দাখিল করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে মোঃ জুবায়ের বিন হায়দার নানা ধরনের অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশে অসঙ্গতি সৃষ্টি, ভুয়া বিল প্রস্তুত, বানোয়াট ভাউচার তৈরি এবং সরকারি অর্থ ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাতের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন কাজের বিল প্রণয়ন ও অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি অংশ যথাযথভাবে ব্যয় না করে আত্মসাত করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল বিভাগসংক্রান্ত ব্যয়ের ক্ষেত্রে ভুয়া বিল প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন বিভিন্ন বিল ও ভাউচার দেখিয়ে সরকারি তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে এবং এসব অর্থের যথাযথ হিসাব সংরক্ষণ করা হয়নি।
এছাড়া সরকারি পুরোনো আসবাবপত্র বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষণ করার অভিযোগও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, সরকারি মালামাল বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি এবং সেই অর্থ সরকারি খাতে জমা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দুদকে দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, মোঃ জুবায়ের বিন হায়দার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, তার নামে ও বেনামে বিভিন্ন স্থানে স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে, যার পরিমাণ ও মূল্য সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগপত্রে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার আসাদ এভিনিউয়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ বর্গফুট আয়তনের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ওই ফ্ল্যাটের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা হতে পারে। তবে এ সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং ক্রয়ের সময়কার আর্থিক তথ্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, পূর্বাচল এলাকায় প্রায় ২০ কাঠা জমি রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা এলাকায় তার নামে কিংবা বেনামে জমি থাকার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে। অভিযোগকারী মনে করেন, এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থের উৎস অনুসন্ধান করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগপত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট কাজের আইডি নম্বরও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, আইডি নম্বর ১২৫৬৪০২, ৯৯৭৮২৭ এবং ৯৯৭৮২৬ নম্বর কাজের বাস্তবায়ন ও ব্যয় সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করলে অনিয়মের বিষয়গুলো স্পষ্ট হতে পারে। এসব প্রকল্পে বরাদ্দ, ব্যয়, বিল অনুমোদন, কাজের অগ্রগতি এবং বাস্তবায়নের তথ্য পর্যালোচনার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অনিয়ম সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। ফলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে অভিযোগকারী উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগকারী তার আবেদনে বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে মোঃ জুবায়ের বিন হায়দারের আয়, সম্পদ এবং জীবনযাত্রার মানের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তার ব্যাংক হিসাব, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, কর নথি, সম্পদ বিবরণী এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করারও দাবি জানানো হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে দেওয়া আবেদনে আরও বলা হয়েছে, অভিযোগগুলো যদি তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে অভিযোগগুলো সত্য না হলে তদন্তের মাধ্যমে তা-ও স্পষ্ট হয়ে আসবে। ফলে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তই এ বিষয়ে সঠিক চিত্র তুলে ধরতে সক্ষম হবে বলে অভিযোগকারী মনে করেন।
জনপ্রশাসন ও উন্নয়ন প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ সরকারি অর্থ জনগণের অর্থ এবং উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যকর পদক্ষেপ জনআস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কেবল অভিযোগ উত্থাপন করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র, আর্থিক তথ্য ও প্রমাণও যাচাই করা জরুরি। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, আর অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থানও পরিষ্কার হবে।
এদিকে অভিযোগপত্রের সঙ্গে পত্রিকার কাটিং সংযুক্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদ ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই তিনি দুদকের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। তবে এসব তথ্যের যথার্থতা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থার ওপর বর্তায়।
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে মোঃ জুবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তপূর্বক সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। অভিযোগকারী আশা প্রকাশ করেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দুর্নীতি দমন কমিশন প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
তবে এ প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে মোঃ জুবায়ের বিন হায়দারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে। একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযোগটি গ্রহণ করেছে কি না কিংবা এ বিষয়ে কোনো অনুসন্ধান শুরু হয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ তদন্ত হলে অভিযোগের সত্যতা, সম্পদের উৎস, প্রকল্প বাস্তবায়নের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে। একই সঙ্গে তদন্তের ফলাফল ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।