বিশেষ প্রতিনিধি : তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের চার মাস পেরিয়ে গেছে। এই স্বল্প সময়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বেশ কিছু প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন—প্রধানমন্ত্রীর এই ভালো চেষ্টাগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন হতে দিচ্ছে না কে বা কারা? সরকারের ভেতরেই কি এমন কোনো মহল সক্রিয়, যারা তারেক রহমানের ‘নতুন ধারার রাজনীতি’র বদলে পুরোনো প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে মরিয়া?
গত মঙ্গলবার বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাঁর অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক দর্শনের কথা স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, ”আমাদের প্রতিহিংসার মানসিকতা বদলাতে হবে। আসুন নিজের চিন্তা কিছুটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে যা হয়েছে, এখন প্রতিশোধ নিলে সেটা ফেরত পাব না। তাই প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আমরা দেশের জন্য কী করতে পারি, সেই চেষ্টা করতে পারি।”
প্রধানমন্ত্রীর এই উদার ও দূরদর্শী আকাঙ্ক্ষা সত্ত্বেও মাঠের বাস্তবতা এখনো ভিন্ন।
মব জাস্টিস ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ: প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও মব সহিংসতা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসেই মব হামলায় অন্তত ৩২ জন নিহত হয়েছেন। যা গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এপ্রিল মাসেও এই সংখ্যা ছিল ২১। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার বর্তমান সরকার করেছে, মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর নতুন মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তারের মতো পুরোনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এমনকি অতি সম্প্রতি জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় নাঈম হাসানকে পুলিশের হেনস্তার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
বেসরকারি খাতের ক্ষত ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা: বিগত দেড় বছরের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে দেশের বেসরকারি খাত ও ব্যবসাবাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কলকারখানায় মব হামলা, অগ্নিসংযোগ, ঢালাওভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ এবং ব্যবসায়ীদের ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ করে সামাজিক হেনস্তা করার কারণে উদ্যোক্তাদের মনোবল ভেঙে পড়েছিল।
বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী নিজে একজন শিল্প-উদ্যোক্তা হওয়ায় তিনি বন্ধ কারখানা চালুর জন্য নতুন বাজেটে আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু কেবল অর্থ সাহায্যই যথেষ্ট নয়, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন একটি নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ।
মিথ্যা মামলা ও হয়রানি: দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দিলেও চার মাসেও তার দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ ও বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা: অন্তর্বর্তীকালীন আমলে বহু ব্যবসায়ীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বেআইনিভাবে জব্দ করা হয়েছিল এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার হওয়া সত্ত্বেও এই বেআইনি নিষেধাজ্ঞাগুলো এখনো পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরছে না।
বিগত ১৭ বছর টিকে থাকার তাগিদে অনেক অরাজনৈতিক ব্যবসায়ীকেও তৎকালীন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর ঢালাওভাবে তাঁদের ওপর চড়াও হওয়া দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ডকেই দুর্বল করছে।
প্রশাসনে ‘অতীতের অপছায়া’ ও চাটুকারদের দৌরাত্ম্য: বিএনপি নেতারা নিজেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া প্রশাসনিক কাঠামো দিয়ে বর্তমান সরকারের পক্ষে সফল হওয়া কঠিন। মাঠপর্যায়ের আমলাতন্ত্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে এখনো বড় ধরনের রদবদল করা সম্ভব হয়নি। সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের আমলে নিয়োগ পাওয়া সিংহভাগ আইন কর্মকর্তা, বিচারক এবং বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত কূটনীতিকরা এখনো বহাল তবিয়তে আছেন, যারা বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক দর্শনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করছেন না বলে অভিযোগ উঠছে।
পাশাপাশি, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চাটুকারদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলেও সরকারের চারপাশে আবার নতুন করে তেলবাজির প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে কে কত বড় দলীয় কর্মী বা নেতা ছিলেন, তা প্রমাণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে আমলাতন্ত্রে। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের সময় যারা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল, তারাও এখন নব্য রূপ ধারণ করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে
সরকারের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ বা প্রাথমিক স্বস্তির সময় শেষ। একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ শান্তি, বৈষম্যহীন ও সমতার বাংলাদেশের প্রত্যাশায় বিএনপিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। মানুষ আর হিংসা ও অরাজকতা দেখতে চায় না।
প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে চাটুকার বা তথাকথিত দলীয় এজেন্ডাধারীদের বাদ দিয়ে যোগ্য, মেধাবী ও দেশপ্রেমিকদের প্রশাসনে নিয়ে আসতে হবে। একই সাথে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা বিগত সরকারের অদৃশ্য বাধা ও অপছায়া দ্রুত দূর করতে হবে। কথা ও কাজের মিল না থাকলে জনগণের মনে দ্রুতই অনাস্থা তৈরি হতে পারে। তাই এখনই পেছনে ফিরে তাকিয়ে ত্রুটিগুলো সংশোধনের মোক্ষম সময়।